ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে টিপসই, বিধবাকে বিয়ে!
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ৪৩ বছর বয়সী এক বিধবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেওয়া হয়। কয়েক দিন পর তাকে ডেকে একটি কাগজে টিপসইও নেওয়া হয়। এরপর হঠাৎ গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে, ওই নারীর বিয়ে হয়ে গেছে এবং তাকে একটি কাবিননামাও দেখানো হয়। তবে ওই নারী দাবি করেছেন, তিনি কোনো বিয়েতে সম্মতি দেননি এবং বিয়ের জন্য কোথাও যাননি।
সম্প্রতি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার একটি গ্রামে এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।
ভুক্তভোগী ওই নারীর স্বামী মারা গেছেন প্রায় ১৩ বছর আগে। এরপর মানুষের জমিতে কাজ করে দুই ছেলেকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে তার নাতি-নাতনিও রয়েছে।
ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে কৌশলে টিপসই নেন আবদুস ছাত্তার নামের এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে স্থানীয় জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। সেই টিপসই ব্যবহার করেই জালিয়াতির মাধ্যমে বিয়ের কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি ওই নারীর।
গতকাল বুধবার তার বাড়িতে গিয়ে কথা হলে তিনি জানান,
"আমি কোথাও বিয়ে করতে যাইনি। কোনো কাজিকেও দেখিনি।"
ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় বর হিসেবে স্থানীয় আবদুল কুদ্দুসের নাম উল্লেখ রয়েছে। ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, কুদ্দুস এর আগে বিভিন্ন সময়ে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেও তিনি কখনো রাজি হননি। কুদ্দুসের সংসারে স্ত্রী সুফিয়া খাতুন, ছেলেমেয়েসহ নাতি-নাতনিও রয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলতে বুধবার সন্ধ্যায় আবদুল কুদ্দুসের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে কুদ্দুসের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন জানান, বিয়ের বিষয়ে তার স্বামী তাকে আগে কখনো কিছু জানাননি। ঘটনা জানাজানি হলে কুদ্দুস দাবি করেন যে, তিনি ওই নারীকে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ করেছেন। পরিবারের সদস্যরা তাকে বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি কারও কথা শোনেননি।
অভিযোগের বিষয়ে আবদুস ছাত্তার তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। স্থানীয় বাজারে তার একটি কসমেটিকসের দোকান রয়েছে। তিনি বলেন, ওই নারীর কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে তিনি কোনো টিপসই নেননি। এলাকার জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে এ ঘটনায় ফাঁসানো হচ্ছে।
প্রকাশ্যে আসা কাবিননামায় দেখা যায়, কাজি গোলাম মোস্তফা বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। এতে আড়াই লাখ টাকা দেনমোহর এবং ৫০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা উল্লেখ আছে। সাক্ষী হিসেবে আবদুল মান্নান ও সাইফুল ইসলামের নাম রয়েছে। তবে সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি কোনো বিয়ের সাক্ষী হননি।
অন্যদিকে কাজি গোলাম মোস্তফাও এই বিয়ে পড়ানোর কথা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ছড়িয়ে পড়া কাগজটি সম্পূর্ণ জাল। এর আগে ২০২০ সালেও তার নামে এমন একটি জাল কাগজ তৈরি হয়েছিল এবং সে ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। এবার আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি পুলিশের সাথে কথা বলবেন বলে জানান।
ঘটনাটি নিয়ে গত সোম ও বুধবার গ্রামে দুই দফা সালিস বৈঠক বসেছে। তবে সালিসে অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার ও আবদুল কুদ্দুস উপস্থিত ছিলেন না। তাদের আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। সালিসে নেতৃত্ব দেওয়া মোহাম্মদ রুস্তম আলী বলেন, "কীভাবে কী হলো, আমরা যাচাই করছি। সালিসের মাধ্যমে সমাধান না হলে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।"
এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান বলেন, ঘটনাটি তারা বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনেছেন। তবে এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিষয়টি নিয়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক জানান, ঘটনাটি জানার পর তারা স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়েছেন। অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার জামায়াতের পদধারী কোনো নেতা নন, বিগত নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন এবং এর আগে তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।
মো. ফজলুল হক আরও বলেন, "আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হোক। তবে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে, ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে।"