শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি

রাজনৈতিক সুপারিশে অন্য স্কুলে পদায়ন মামুনের

নিজস্ব প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম

শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন

কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার এক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে শাস্তির বদলে বারবার বদলি করার অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারির প্রথম দিকে তার বিরুদ্ধে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার পর বিচারের মুখোমুখি না হয়ে তিনি পলাতক ছিলেন। অবশেষে গত সেপ্টেম্বরের শেষ তারিখে তাকে পুনরায় স্বনামধন্য ‘চর রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’ বদলি করা হয়েছে।


এই বদলির খবর ছড়িয়ে পড়লে চর রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে এভাবে বারবার বদলি করায় শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


সাজাইয়ের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছব্দের আলীর দেওয়া তথ্যমতে, অভিযুক্ত শিক্ষক মামুন (পিতা: বাদশা মিয়া, গ্রাম: কেসের মারি টাঙ্গাইল পাড়া) ২০২০ সালে 'সাজাইয়ের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে' যোগদান করেন। সেখানে কর্মরত থাকার পর, ২০২৬ সালের প্রথম দিকে তাকে বদলি করে 'সাজাই নতুন গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে' আনা হয়।


জানা যায়, সাজাই নতুন গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর ওই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন যাবত শারীরিক কুপ্রস্তাব ও যৌন হয়রানি করে আসছিলেন তিনি। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।


এ ঘটনার পর ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ বজলুর রহমান বিচারের উদ্যোগ নেন এবং পরদিন সকাল ১০টায় বিদ্যালয় মাঠে উপযুক্ত বিচারের জামিনদার হন। কিন্তু সঠিক সময়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মামুন সালিশি বৈঠকে উপস্থিত না হয়ে গা-ঢাকা দেন।


এক ভিডিও বার্তায় এবং লিখিত অঙ্গীকারে সহকারী শিক্ষক বজলুর রহমান বলেন, "সঠিক সময়ে আমি অভিযুক্ত মামুনকে হাজির করতে ব্যর্থ হই। এ কারণে এলাকাবাসীর সাথে একমত হয়ে আমি ওই শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি করছি। অভিযুক্ত মামুনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি সার্বিক সহযোগিতা করব।"


পলাতক ও অভিযুক্ত সেই শিক্ষককে শাস্তির আওতায় না এনে উল্টো চর রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পুনরায় বদলি করায় সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন অভিভাবকরা। এমন শিক্ষক বিদ্যালয়ে থাকলে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে অনেকেই নিজেদের ছেলে-মেয়েদের স্কুল থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রফিকুল ইসলাম বলেন, "চর রাজিবপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ। আমরা এখানে পড়েছি, বর্তমানে আমার মেয়েও পড়ছিল। কিন্তু এমন একজন শিক্ষকের বদলির কারণে মেয়েকে ওখানে আর পড়াবো না।"

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) এম. জি. আরিফ উদ্দীনের কাছে জানতে চাওয়া হয় একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে কেন শাস্তি না দিয়ে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে বদলি করা হলো? জবাবে তিনি দাবি করে মুঠোফোনে বলেন, "বিএনপির আহ্বায়ক সাহেব শিক্ষা কমিটির একজন সদস্য। কমিটির বৈঠকের দিন তিনি কমিটির কাছে শিক্ষক মামুনের বিষয়ে সুপারিশ করেন। পরে তার সুপারিশ ও শিক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি বদলির আদেশ জারি করি।"

শিক্ষা অফিসারের এমন দাবির বিষয়ে জানতে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে কথা বলে মফস্বল সংবাদ প্রতিবেদক। মি. মোখলেস মুঠোফোনে বলেন, "শিক্ষক মামুন হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ইতিমধ্যে আপস-মীমাংসা হয়ে গেছে। এর আগে তাকে কোনো আনুষ্ঠানিক বদলি করা হয়নি, বরং অভিযোগের কারণে তাকে সাময়িকভাবে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছিল। ডেপুটেশন বাতিল হওয়ার পর এখন তাকে নতুন কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। একটি নির্ধারিত কমিটির সভার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকভাবে এই বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।"

শিক্ষা কমিটির আরেক সদস্য ও উপজেলা জামায়াতের আমির আবুল বাশার মো. আব্দুল লতিফ কাছে এবিষয়ে জানতে একাধিক বার তার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি।

অভিযুক্ত শিক্ষককে নিজ প্রতিষ্ঠানে পদায়নের বিষয়ে চর রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফরোজা আক্তার জানান, "পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল-মামুনের যোগদানের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিভাবক সরাসরি আমার কাছে কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেনি। এ বিষয়ে অভিভাবকদের কোনো অভিযোগ থাকলে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে পারেন। এছাড়া অভিভাবকরা যদি মনে করেন যে ওই শিক্ষকের কারণে তারা তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয় সেক্ষেত্রে তারা তাদের সন্তানদের অন্য স্কুলে নিয়ে যাবেন, তবে সেটা সম্পূর্ণ তাদের ব্যক্তিগত অধিকার।"

স্থানীয়রা জানায়, যার বিরুদ্ধে নিজ প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীকে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে এবং যিনি বিচারের মুখোমুখি না হয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, তাকে শাস্তির আওতায় না এনে পুনরায় আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বদলি করা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়। দ্রুত এই বদলির আদেশ বাতিল করে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।

প্রধান সম্পাদক: মো. নূরুল হক

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: আজরত পাড়া, মহাখালী, ঢাকা ১২১২।

ইমেইল: mofossolsangbad@gmail.com

মোবাইল: 01626605495