ব্যাংক রেজল্যুশন আইন পাস: ‘লুটপাটকারীদের’ মালিকানায় ফেরার পথ উন্মুক্ত!
মফস্বল সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম
সংসদে পাস হওয়া নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে যুক্ত একটি ধারা ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশটি এখন আইনে পরিণত হলেও, এতে এমন একটি বিধান সংযোজন করা হয়েছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষ।
নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী, একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক শেয়ারধারী বা মালিকরা আবারও সেই ব্যাংকের মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ পাবেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ অতীতে যেসব মালিকের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংকগুলো সংকটে পড়েছিল, তারাই আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন।
সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে মালিকানা ফিরে পাওয়ার শর্ত। আইনে বলা হয়েছে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধারে যে অর্থ সহায়তা দিয়েছে, তার মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জমা দিলেই সাবেক মালিকরা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারবেন। বাকি অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ হারে সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
আইনের ১৮ (ক) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আগের শেয়ারধারীরা কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি পুনরায় ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে পৃথক অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
অঙ্গীকারনামায় উল্লেখযোগ্য শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে— সরকারের ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, নতুন মূলধন জোগান দিয়ে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধ এবং সব ধরনের কর ও আর্থিক দায় মিটিয়ে ফেলা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় আর্থিক সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন শিথিল শর্ত রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নামমাত্র অর্থ জমা দিয়ে তারা আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আসতে পারলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা থেকেই যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই আইনের ফলে আগের মালিকদের জন্য ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া সহজ হয়ে গেছে। তাদের মতে, একবার মালিকানা ফিরে পেলে পরবর্তীতে তাদের সরানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
আইনটি পাসের আগে এ বিষয়ে আপত্তি উঠলেও শেষ মুহূর্তে বিতর্কিত ধারাটি যুক্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও এই ধারা না রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, আইনের বাকি অংশে বাংলাদেশ ব্যাংককে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠনে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসক নিয়োগ, মূলধন বৃদ্ধি, সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, অস্থায়ী ব্রিজ ব্যাংক গঠন, সরকারি সহায়তা প্রদান এবং প্রয়োজনে ব্যাংক অবসায়নের বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উল্লেখ্য, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এই ব্যাংকটি বিপুল মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে নতুন আইনের বিতর্কিত ধারা ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।